এ কোন বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

বসন্ত এসে গেছে! হ্যাঁ, পড়ন্ত শীতে উত্তুরে বাতাস মিইয়ে যাচ্ছে। জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় প্রকৃতি সাজতে বসেছে নতুন রঙে। মাঘ বিদায় নিয়েছে; বসন্ত সমাগত। বসন্ত কি তাই, যখন রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী তার পরম পুরুষ রঞ্জনের জন্য আকুল হয়? বসন্ত কি তাই, যখন গাঁদা ফুলে ভরা হলুদ মাঠের কোনো একটি ফুল তরুণীর খোঁপায় সাম্রাজ্য ঘোষণা করে? বসন্ত কি তাই, যখন বাতাস চঞ্চল, চিত্ত চঞ্চল আর ধরণী হয়ে ওঠে ব্যাকুল? বসন্ত কি তাই, যখন কোনো প্রিয় মানুষের দিকে তাকাতে গিয়ে তা কখন যেন প্রেমের টান হয়ে আবেগমথিত দৃষ্টিতে আবার তাকাতে বলে? তা যদি হয়, তবে বসন্ত এসেছে।
বসন্ত খুব স্বার্থপর। সে এখন করপোরেট ভোগবাদী বিজ্ঞাপন ছাড়া আসে না। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আজ আর ঋতুরানীর আগমনী সংকেত জানায় না। নগরে সেই বৃক্ষ কই, যে বসন্তের আগমনী ধ্বজা উড়াবে! এ এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে ইটের দালানে বসন্ত বাতাস ধাক্কা খেয়ে তা হয়ে যায় অকাল বসন্ত। রঞ্জনের বীরদর্পে হেঁটে আসা রঙিন মেঠোপথের রাঙা ধুলো নেই আজ, যে ফাগুনের পুষ্পরেণু নিয়ে হাজির হবে উৎসবের চেহারা নিয়ে। তাবৎ প্রেমিক-প্রেমিকা যেন আজ স্নানঘরে মোবাইল ফোন খুলে লাইভ ভিডিওতে মশগুল। অথচ তাদের আজ সমস্বরে বলার কথা- আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে!
অধিকাংশ ধারণায় ভালোবাসা হলো নিঃস্বার্থতা, স্বার্থপরহীনতা, বন্ধুত্ব, মিলন ও পারিবারিক বন্ধন। এককথায় বললে, দুঃসময়ের ঝড়ো হাওয়ায় আশ্রয় হিসেবে যে ছাতাটি মাথার ওপরে মেলে ধরা হয়, তারই নাম ভালোবাসা। ভালোবাসার শক্তি নাকি পরাজয় মানে না। শত মিথ্যা আর কুটিলতার আক্রমণের মুখেও থাকে অটল। ধ্রুব সত্যের মতো স্থির আর দ্রোহী সত্তার মতো একরোখা। তাই ভালোবাসা নামক এই বিচিত্র অনুভূতিকে নিয়ে যুগে যুগে অগণন কবি, সাহিত্যিক, গায়কের সৃজনে রচিত হয়েছে অজস্র সৃষ্টি। তেমনি একটি রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী। যেখানে রাজা ভালোবেসে কাছে পেতে নন্দিনীকে বলেছিলেন, ‘আমার অনবকাশের উজান ঠেলে তোমাকে ঘরে আনতে চাই নে। যে দিন পালের হাওয়ায় তুমি অনায়াসে আসবে সেই দিন আগমনীর লগ্ন আসবে। সে হাওয়া যদি ঝড়ের হাওয়া হয় সেও ভালো। এখন সময় হয়নি।’ রাজাকে ভালোবাসেনি নন্দিনী, কিন্তু রাজার মানসিক উত্তরণে, তাকে ভ্রান্ত প্রেমভাবনা থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করেছিল সে। রাজা চাইত নন্দিনীকে হাতের মুঠোয় পুরতে। কিন্তু নন্দিনী তো মুঠোয় পোরার নয়; সে হৃদয়ের সম্পদ। তাই অস্থির রাজা নন্দিনীকে ফিরিয়ে দিত। কিছুক্ষণ পরই আবার রাজা নন্দিনীকে পাশে বসিয়ে শিশুর মতো কৌতূহল নিয়ে নন্দিনী ও রঞ্জনের ভালোবাসার গল্প শুনত। শুধু তাই নয়, নন্দিনী যখন জানিয়েছে, রঞ্জনের জন্য নিজের প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারে, তখন রাজার রীতিমতো বিস্ময় জেগেছে। ভালোবাসার জন্য যে প্রাণ পর্যন্ত দেওয়া যায়- রাজার বস্তুসর্বস্ব মন বিশ্বাসই করতে পারেনি। কারণ রক্তকরবীর যক্ষপুরীতে প্রেমের আগমন রুখতে দ্বাররক্ষীদের ছিল সতর্ক প্রহরা। আজ যেমন ঘরে ঘরে প্রেমের ওপর চলে অবরোধ। তাই আজ বসন্ত চুরি করে এসে মুখ লুকায় মোবাইল ফোনের স্ট্ক্রিনে। ফুল না ফুটিয়ে, হুল ফুটিয়ে বেদনা দিয়ে কখনও কখনও অনলাইন-বসন্ত অকালেই মারা যায়।
বাঙালির ক্যালেন্ডারে ১৪ ফেব্রুয়ারি এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। বাংলাদেশে স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র প্রতিরোধ দিবস। ‘এমন বসন্ত দিনে’ শহীদ জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালির রক্তে রচিত হয়েছিল বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ। বাংলা হয়েছিল উত্তাল। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকার, গণমুখী-বৈজ্ঞানিক-অসাম্প্র্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে। সেখানে পুলিশ বিনা উস্কানিতে বেধড়ক লাঠিচার্জ, ইটপাটকেল ও বেপরোয়া গুলি ছুড়লে গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল। তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়। দীপালি সাহার লাশ গুম করে ফেলে পুলিশ। জানা যায়, শুধু সরকারি হিসাবেই ওই দিন গ্রেপ্তার করা হয় ১ হাজার ৩৩১ ছাত্র-জনতাকে। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি ছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম শহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান কাঞ্চন। পরের বছর ১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে খুব কাছ থেকে গুলি করিয়ে হত্যা করান ছাত্রনেতা রাউফুন বসুনিয়াকে। বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন ও প্রতিরোধ ইতিহাসের এমন চমৎকার দিনটি আমরা ভুলে যাচ্ছি। করপোরেট কালচারের প্রভাব দিবসটি আমাদের কাছ থেকে প্রতি বছর আড়াল করতে চায়। ২১ ফেব্রুয়ারির পর ইতিহাসের এত বড় তাৎপর্যময় বিশাল ছাত্র আন্দোলন তাদের চক্রান্তেই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। ভালোবাসাবাসিকে কেবল দু’জনের মধ্যে বৃত্তবন্দি করে স্বার্থপর বানানো হয়েছে। নেপথ্যে রয়েছে ভোগবাদী মিডিয়া।
কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই, যে ভালোবাসে বা যিনি ভালোবাসতে জানেন, তাকে অবশ্যই স্বৈরাচার প্রতিরোধ সংগ্রামে নামতে হবে। কারণ, স্বৈরাচারের অধীনে ভালোবাসা বিকশিত হয় না। নিজেকে নিজে স্বাধীন করতে কিংবা প্রিয় মানুষকে ভালোবেসে দিতে (কিংবা পেতে!) স্বৈরাচারের নিপাত দরকার! ভালোবেসে প্রিয় মানুষকে ফুল দিতেও সাহস দরকার। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে ১৯৮৪ সালে এ রকম এক বসন্ত আগমনীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন যারা, বসন্ত-ভ্যালেন্টাইন-ভালোবাসার ডামাডোলে তাদের আমরা কীভাবে ভুলতে পারি?
সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

Somokal

Leave a Reply

Close Menu