বাস্তবায়নযোগ্য একটি মৌলিক দাবি

প্রতি বছরই একুশ এলে কিছু না কিছু একুশকে উদ্দেশ করে লিখি। এবার লিখতে গিয়ে ঘটনাক্রমে হাত পড়ল ২০১২ সালে আমার প্রকাশিত একটি লেখা একুশের ওপর, যেখানে আমি নিশ্চিত প্রত্যয় নিয়ে বলেছি যে, মাতৃভাষা সর্বস্তরে প্রচলিত না হলে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না। এ কথাও খুব সঠিকভাবে বলেছি যে, কিছু শিক্ষিত মানুষ ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ চালাতে পারবে ঠিকই; কিন্তু সর্বমানুষকে অর্থাৎ জনসাধারণকে উন্নতির কাতারে নিয়ে আসতে গেলে বাংলা ভাষার সার্বিক প্রচলনের বিকল্প নেই।
কিন্তু ছয় বছর পর ঠিক এ জোরটাই যেন আমি পাচ্ছি না। কেন পাচ্ছি না, তার একটা বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্যই লেখাটি। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম সবসময় বলতেন, বাংলা ভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চা না করলে বাংলাদেশ কোনোদিন বৈজ্ঞানিক সমাজে রূপান্তরিত হতে পারবে না। সমান্তরাল আরেকটি অনুযোগ বহু আগে করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বলেছিলেন, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি।’ কিন্তু একদিন এক ছাত্রীর বাচ্চাকে এত সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলতে শুনলাম যে, ভাবলাম কে কোন ভাষায় কথা বলছে সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু যে ভাষায় বলছে, সেটা শেখার প্রক্রিয়াটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ এখন আমার কাছে প্রতীয়মান, মাতৃভাষার মতো সমান দক্ষতায় শিশু অন্য ভাষা শিখতে পারে, যদি সে পরিবেশ দেওয়া যায়। যদিও ভাষা মানুষের চিন্তার পরিপূর্ণ বাহক নয়; তারপরও ধারণা করা যায়, চিন্তার বহিঃপ্রকাশের সময় মাতৃভাষাই মানুষের জন্য পরম মাধ্যম। কিন্তু কথাটা আর বাস্তব মনে হয় না। মাতৃভাষা নয়, কিন্তু ভালোভাবে রপ্ত হয়েছে সে রকম ভাষায়ও মৌলিক চিন্তা প্রকাশ করা যায়। আমার এক বন্ধু যখন বাংলা বা ইংরেজি দুটিতেই অনার্স পড়ার সুযোগ পায়; তার এক আত্মীয় বললেন, কী আশ্চর্য! বাংলা আবার পড়তে হয় নাকি? ওটা তো নিজেই পড়তে পার। ইংরেজিতে পড়; কত স্মার্ট ভাষা!
একুশের চেতনার একটি মৌলিক বাস্তবায়নযোগ্য দাবি হলো সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা। বাংলাদেশ হওয়ার অব্যবহিত পরে ইংরেজি পেপারে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে স্নাতক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা পাস করছিল না। তখন ইংরেজি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। পরে সম্ভবত তিন বছর পর সেটি ফিরিয়ে আনা হয়। সম্ভবত অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীই প্রথম, যিনি ইংরেজি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেন একটি শ্রেণিগত বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাকে মাথায় রেখে। ইংরেজি শেখার আবশ্যকতা যদি শিক্ষা-যোগ-জীবিকার একটি মৌল চাহিদা হয়ে থাকে; স্বীকার করতে হবে যে, এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা দুরূহ হবে। সমাজের হালচাল দেখে এটা বুঝতে না পারার কোনো কারণ নেই যে, মাতৃভাষার ব্যবহার নিয়ে আমরা বিরাট একটা আত্মপ্রবঞ্চনাকে নিশ্চিত প্রত্যয় হিসেবে ধরে নিয়েছি। আমরা দেখছি যে, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু রাখা বাস্তবে সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই এ ব্যাপারটা নিয়ে জিদ ধরে থাকি। একুশে ফেব্রুয়ারি বা পহেলা বৈশাখকে যে আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব দিবস বলা হয়, সেটা এ জন্যই। সমাজ জীবন বলতে যা বুঝি, সেটা আসলে কোনো কিছুকে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে না। বাংলা সর্বস্তরে চালু হওয়ার প্রত্যয় যদি এক রকমের আবশ্যিকতা হারিয়ে ফেলে, তা হলে সমাজ সেটাকে টেনে ধরে রাখবে না, প্রচেষ্টা যত মহৎই হোক না কেন। তাই বাংলা ভাষা সর্বস্তরে চালু হোক- এটি এখন কেবল রেটরিক বা বাগাড়ম্বর।
আমি এটা বলছি না যে, বাংলাদেশে কোনোদিন ইংরেজি বা আরবি, হিন্দি বা উর্দু বাংলা ভাষার স্থান দখল করে নেবে। সেটা কোনোদিন হবে না, হওয়ারও নয়। ইংরেজির প্রবল প্রতিপত্তি সত্ত্বেও আমরা এমন ইংরেজি শিখিনি যে হাটে-বাটে-মাঠে অকাতরে ইংরেজি বলে যাচ্ছি বা পত্রপত্রিকা ইংরেজি লেখায় ভুরভুর করছে বা একুশের বইমেলায় ইংরেজিতে বাংলাদেশিদের লেখা বইয়ে স্টল ভরে যাচ্ছে। অন্যদিকে ইসলামকে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ধর্মতে পরিণত করলেও এমন ধর্মীয় ঔপনিবেশিকতা আমাদের গ্রাস করেনি যে, আমরা বটগাছ ভুলে খেজুর গাছকে পূজা করছি বা মেঘনা নদীমাতৃক পরিবেশের চেয়ে মরুভূমির বালুময় অঞ্চলকে স্বস্তিকর মনে করছি বা আরবিতে বাতচিৎ করছি। যদিও ইংরেজি বিশ্বনেতৃত্ব প্রদানকারী ভাষা হিসেবে আমাদের যথেষ্ট উপনিবেশিত করে রেখেছে এবং ধর্মীয় ঔপনিবেশিকতার দিক থেকে আরবিও খানিকটা চেষ্টা করা শুরু করেছে। এখন ‘কেমন আছেন’- এ প্রশ্নটা করলে যেটি উত্তর আসে সেটি কিন্তু বাংলা শব্দ নয়। বাংলাদেশের বিরাট সুবিধা এটা যে, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং হিরণ পয়েন্ট থেকে জাফলং কোথাও বাংলা ভাষার বিকল্প অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করতে হয় না। সেদিক থেকে বাংলা সর্বস্তরে চালু না হওয়ার কোনো কারণ নেই; কিন্তু কারণ আছে। কারণটা দ্বিমাত্রিক, যদিও পরস্পর পরিপূরক।
আমার বেশ কয়েকজন কবি বন্ধু তাদের কবিতাসমগ্র অন্যের কৃত ইংরেজি অনুবাদে বের করেছেন। উদ্দেশ্য, ব্যাপক ইংরেজি বিশ্বপাঠকের কাছে পরিচিত হওয়া। বন্ধুদের এ মনস্কামনার সঙ্গে ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথের নিজের কিছু কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করে ইংরেজি বিশ্বপাঠক মহলে পরিচিত হওয়ার মিল আছে। এটার অর্থ হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের সময়কার শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজি ভাষা কালক্রমে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বিশ্বভাষায় পরিণত হয়েছে। ফলে আমাদের কবি-লেখকরাও চান ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে বিস্তৃত হতে। ঠিক এর পাশাপাশি আরেকটা ছবি হলো, সাংখ্যিক প্রযুক্তির যুগে বিশ্বসমাজের একরৈখিক চেহারা প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ববিদ রোনাল্ডো রিসাল্টো বলছেন, মানব সমাজের নৃতাত্ত্বিকভাবে এক এক গোত্রের নির্দিষ্ট মৌল দেহসৌষ্ঠব থাকলেও, সাংস্কৃতিক দিক থেকে মানব সমাজ কৌম। মানব সমাজ তার মতে ছিদ্রান্বিত। ছিদ্রবিহীনতা তার থাকতে পারে না। হার্ভার্ডের সংস্কৃতি পাঠের অধ্যাপক হোমি কে ভাবা বলছেন, সমাজ সংজ্ঞায়িত ও বিশেষায়িত হয় কেন্দ্রে নয়, প্রান্তে; সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে। লেনদেন, আদান-প্রদানের মাধ্যমে। আরেক নৃতত্ত্ববিদ জন ডিক্সন বলছেন, মানব সমাজ হচ্ছে ট্রেন স্টেশনের লাউঞ্জের মতো। আসা-যাওয়াটাই সত্য; থাকাটা নয়।

Somokal

Leave a Reply

Close Menu