বিশ্বাসে বিশ্বাসে অবিশ্বাস তবুও!

ইন্টারফেইথ শব্দটির সঙ্গে আমার আভিধানিক পরিচিতি হয়তো বাংলাদেশে থাকার সময়ও ছিল; কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ সম্পর্কে প্রথম ও প্রত্যক্ষ জানলাম যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর। অভিধানে ইন্টারফেইথ শব্দটির মানে হতে পারে আন্তঃধর্মীয় বিষয়, অর্থাৎ বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসীদের এক ধরনের মিলনমেলা। এই ইন্টারফেইথের ধারণাটা খুব বেশি পুরোনো নয়; শব্দটির প্রথম ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় ১৯৩২ সালে। অর্থটি আসলে বেশ সহজ, যখন কোনো কাজে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী একত্রিত হন, তখন সেটি ইন্টারফেইথের আওতায় পড়ে। এই বিশেষ ও ব্যতিক্রমী বিশেষণের ব্যবহার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কাছে খুব একটা জানা কথা নয়। বাঙালিরা আন্তঃধর্মীয় সংঘাত ও সংঘর্ষটা বোঝে, সংখ্যায় যারা গুরু তারা লঘুদের লঘুতর করে দেখার চেষ্টা করেন এবং গণতন্ত্রে সংখ্যার হিসাবটাকেই কেবল বড় করে দেখেন, বুঝেও বোঝেন না যে, ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূমিকা যতই প্রভাব বিস্তার করুক না কেন, আর্থ-সামাজিক বিশ্নেষণে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক নয়, বিষয়টি সংখ্যাতীতও বটে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মানুষ সংখ্যাগুরুর গুরুভার বহন করতে করতে এতটাই ক্লান্ত যে, সেখানে আন্তঃধর্মীয় সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সুযোগ নেই বললেই চলে। ইন্টারফেইথ শব্দটির প্রয়োগ যুক্তরাষ্ট্রে মূলত আন্তঃধর্মীয় অর্থে; তবে এর সংজ্ঞা ও প্রয়োগ সম্প্রসারিত করলে তা কেবলই ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে আবদ্ধ নয়, তা সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিষয়ও বটে। আর সেক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পরস্পরকে বোঝার অভাব রয়ে গেছে, সেখানেও রয়েছে বিভেদ ও বিভ্রান্তি।
বাংলায় যে প্রচলিত বাক্য, ‘বিশ্বাসে মিলায় স্বর্গ, তর্কে বহুদূর’, তাতে বাহ্যত বিশ্বাসের ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে, যুক্তির ওপরে নয়। কিন্তু কোনো রকম কূটতর্ক কিংবা বিশ্বাসভঙ্গের কোনো কথা না বলেও বিশ্বাসে বিশ্বাসে মিলন তো হতেই পারে। তার জন্য নিজের বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে এমনও তো নয়। আর সে বিশ্বাস যদি পরস্পরবিরোধীও হয়, তাহলেও কর্মজগতে এমন অনেক জায়গা রয়ে গেছে, যেখানে আমরা যে যার ধর্মীয় বিশ্বাসকে বজায় রেখেও একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারি আর তার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে এই আমেরিকায়। সংখ্যার হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র খ্রিষ্টানপ্রধান দেশ; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে যেহেতু রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের পার্থক্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে, সেহেতু রাষ্ট্র কোনোভাবেই যেমন ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না, তেমনি ধর্মও রাষ্ট্রকে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। সে জন্যই যুক্তরাষ্ট্র সাংবিধানিক বিবেচনায় একটি সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা যে ধর্মহীনতা নয়, সে কথা স্বীকৃত যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র। এখানে এক ধর্মকে অন্য ধর্মের বিপক্ষে দাঁড়াতে দেখি না। নিজের ধর্মের প্রতি অবিচল বিশ্বস্ততা সত্ত্বেও পরের ধর্মের প্রতি সম্মান এখানকার সমাজে সাধারণভাবে লক্ষ্য করা যায়। এখানে পাশাপাশি গির্জা, মসজিদ, সিন্যাগগ (ইহুদিদের প্রার্থনার স্থল), মন্দির কিংবা গুরুদুয়ারার অবস্থান। জুমা কিংবা ঈদের নামাজের সময় যেসব মসজিদে স্থান সংকুলান হয় না, সেসব স্থানে নামাজের সময়ে গির্জা কিংবা সিন্যাগগ খুলে দিতে দেখেছি, যা আমার জানামতে অন্য কোনো দেশে আছে বলে শুনিনি। এই উদারতা সম্ভব হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে সব ধর্মকে সমানাধিকার দেওয়ায়, সে কেবল সংবিধানে নয়, প্রয়োগ ক্ষেত্রেও।
ধর্মচর্চার বাইরেও সামাজিকভাবে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর মধ্যে যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তারই উলেল্গখযোগ্য উদাহরণগুলো পাই আমরা এই যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টারফেইথভিত্তিক দর্শন, যা ব্যক্তিকভাবে যেমন, তেমনি সাংগঠনিকভাবেও বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসী, এমনকি যারা ধর্মে বিশ্বাসই করেন না তাদের সবাইকে নিয়ে আসতে পারে কর্মজগতে একই সংগঠনের আওতায়। যেমন ধরুন যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপলিসে গির্জা, সিন্যাগগ এবং মসজিদ মিলিয়ে ১৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই ইন্টারফেইথের আওতায় একত্রিত হয়ে গৃহহীন এবং দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সাহায্যে কাজ করে যাচ্ছে। আবার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ইন্টারফেইথ আন্দোলনের লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষা, সংলাপ এবং সেবার মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের মানুষের জন্য সমঝোতা, সম্মান ও সমর্থনের সেতুবন্ধ নির্মাণ করা। এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে এ রকম অসংখ্য ইন্টরফেইথ সংগঠন মানুষকে কূপবদ্ধ ও প্রথাসিদ্ধ ধারণার বাইরে নানান ধর্মবিশ্বাসের মানুষকে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে এবং অনেকেই এসব আন্তঃধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবেই কাজ করছেন কেবল সমাজে সমস্যা জর্জরিত নিম্নবিত্তের মানুষের জন্যই নয়; শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং চেতনাকে আরও বেশি শানিত করতে। সেসব সংগঠনে মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসীরা যোগ দিচ্ছেন নিজেদের ধর্মবিশ্বাস বহাল রেখেই।

Somokal

Close Menu